মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬ - ১০:১৮
বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মতুষ্টি মানুষের চিন্তা ও অগ্রগতিকে থামিয়ে দেয়: পানাহিয়ান

জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার ক্ষেত্রে নিজের অর্জনেই সন্তুষ্ট হয়ে থেমে যাওয়া মানুষের চিন্তার বিকাশ, আত্মসংশোধন ও অগ্রগতির পথে অন্যতম বড় বাধা। মানুষ কোনো অর্জন করার পর ধীরে ধীরে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সতর্ক না থাকলে সেই অর্জনই একসময় তার পরিচয়ের অংশ হয়ে যায় এবং নতুন কিছু শেখা ও নিজেকে সংশোধনের পথে বাধা সৃষ্টি করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ধর্মীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলিরেজা পানাহিয়ান টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘সমত-এ খোদা’-তে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী ও ঐক্য সপ্তাহের সূচনা উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে মানুষের চিন্তা-পরিচালনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মতুষ্টির ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, সমাজে যে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তার অন্যতম হলো—মানুষ নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চিন্তাগত অর্জনের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে।

তিনি বলেন, জ্ঞান, মেধা, অভিজ্ঞতা কিংবা শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে সাফল্যের কারণে মানুষ এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে তার মনে হতে পারে—আর নতুন কিছু শেখা বা নিজেকে সংশোধন করার প্রয়োজন নেই। অথচ এই আত্মতৃপ্তির অনুভূতিই মানুষের চিন্তার গতিশীলতা কমিয়ে দিতে এবং তার মানসিক বিকাশ থামিয়ে দিতে পারে।

ন্যূনতম অর্জনেই সন্তুষ্ট থাকার প্রবণতা
হুজ্জাতুল ইসলাম পানাহিয়ান এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানের একটি ধারণার কথা উল্লেখ করে বলেন, মানুষের মধ্যে কখনো কখনো ‘ন্যূনতম অর্জনেই সন্তুষ্ট থাকার’ প্রবণতা দেখা যায়। অর্থাৎ মানুষ সবসময় সর্বোত্তম অবস্থায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে না; বরং নিজের কাছে ‘যথেষ্ট ভালো’ মনে হওয়া অবস্থাতেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়।

তিনি বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত অবস্থাকে ধরে রাখতে চায়। কারণ পরিবর্তন, আত্মসংশোধন এবং আরও ভালো অবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে মানসিক শক্তি ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ফলে মানুষ সতর্ক না থাকলে নিজের অর্জনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং একসময় সেই অর্জনগুলোই তার পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।

কোনো বৈজ্ঞানিক, সামাজিক কিংবা আধ্যাত্মিক অর্জন যখন মানুষের কাছে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়, তখন প্রাথমিক সন্তুষ্টি ধীরে ধীরে আত্মতুষ্টিতে রূপ নিতে পারে। এর ফলে সে আরও উন্নতির জন্য চেষ্টা করা থেকে বিরত হয়ে যেতে পারে।

আত্মতুষ্টি সমালোচনা গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়
তিনি বলেন, আত্মতুষ্টি মানুষের চিন্তা ও আত্মসংশোধনের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কেউ নিজের অর্জনেই সন্তুষ্ট হয়ে গেলে সাধারণত সমালোচনার প্রতি তার প্রতিরোধও বেড়ে যায়। কারণ সে সমালোচনাকে নিজের পরিচয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখতে পারে। ফলে আত্মপর্যালোচনা ও সংশোধনের পরিবর্তে সে নিজেকে রক্ষা করতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, শিক্ষাগত, বৈজ্ঞানিক, ক্রীড়া এবং এমনকি আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও এর উদাহরণ দেখা যায়। কখনো একটি ছোট সাফল্যই মানুষের মধ্যে আত্মতৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে এবং সেই অনুভূতিই তাকে পরবর্তী অগ্রযাত্রা থেকে বিরত রাখে।

আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও মানুষ নিজের অতীতের ইবাদত ও অর্জন নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে মনে করতে পারে যে, সে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অথচ একজন মুমিনের উচিত সবসময় জ্ঞান বৃদ্ধি, আত্মসংশোধন ও উন্নতির পথে এগিয়ে চলা।

জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যেন অগ্রগতির বাধা না হয়
চিন্তা-পরিচালনার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের মনকে সবসময় শেখা, নিজেকে সংশোধন করা এবং সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যদি মানুষকে থামিয়ে দেয়, তাহলে সেটিই একসময় তার বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ইসলামের ইতিহাসের উদাহরণ তুলে ধরে পানাহিয়ান বলেন, এমন অনেক ব্যক্তি ছিলেন, যারা অত্যন্ত মেধাবী, অভিজ্ঞ ও সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মতুষ্টির কারণে সত্য গ্রহণ করতে পারেননি। তাদের সমস্যা সবসময় বুদ্ধি বা মেধার অভাব ছিল না; বরং তাদের চিন্তা নিজেদের অর্জন ও ধারণার নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আটকে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, একজন মানুষ অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা জানলেও যদি সত্যের সামনে নিজের চিন্তা পুনর্বিবেচনা করতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে সেই জ্ঞান তার উন্নতির মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে হেদায়েতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও কেন সত্য প্রত্যাখ্যান করেন?
ইসলামি সমাজে এ বিষয়টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পানাহিয়ান বলেন, আমাদের ভেবে দেখা উচিত—কেন কখনো জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও কিছু সত্যের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন? এর একটি কারণ মানুষের বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও অভিজ্ঞতালব্ধ অর্জনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

তিনি পবিত্র কোরআন অধ্যয়ন এবং আত্মতুষ্টি সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে বিশ্লেষণের ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, কোরআন যদি মানুষের জ্ঞান ও চিন্তাগত অর্জনের কারণে তার থেমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ এটি শুধু ব্যক্তিগত বা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা নয়; বরং সমাজের চিন্তাধারা ও পরিচালনার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, মানুষ যখন নিজের জ্ঞান নিয়ে অহংকারে আক্রান্ত হয়, তখন তার সামনে সুস্পষ্ট সত্য উপস্থিত হলেও সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করতে পারে। তাই একজন মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—শেখা, নিজের চিন্তা পুনর্বিবেচনা করা এবং সত্য গ্রহণের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকা।

সঠিক বিশ্বাসও যেন আত্মতুষ্টির কারণ না হয়
ইসলামি সমাজের কিছু সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে হুজ্জাতুল ইসলাম পানাহিয়ান বলেন, একটি বড় বিপদ হলো নিজের সঠিকতার ব্যাপারে অহংকার। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা সমাজ সঠিক বিশ্বাসের অধিকারী হওয়ার কারণে মনে করতে পারে যে, তার আর এগিয়ে যাওয়া, চেষ্টা করা, নিজেকে সংশোধন করা কিংবা সামাজিক দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন নেই।

তিনি বলেন, এমনকি সঠিক বিশ্বাস ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অধিকারী হওয়াও যদি দায়িত্ববোধ, চিন্তা, কর্ম ও প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তাহলে তা মানুষকে এক ধরনের আত্মতুষ্টির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলাম ও আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষার সত্যতার প্রতি ঈমান মানুষের দায়িত্ব আরও বাড়াবে; সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর অজুহাত তৈরি করবে না।

শেখা ও আত্মসংশোধনের পথ খোলা রাখতে হবে
তিনি বলেন, এই ক্ষতিকর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের মনকে সবসময় শেখা, সংলাপ, সমালোচনা ও আত্মসংশোধনের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। বৈজ্ঞানিক, অভিজ্ঞতালব্ধ কিংবা আধ্যাত্মিক অর্জন যেন আমাদের থেমে যাওয়া ও আত্মতুষ্টির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়—এ বিষয়ে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে।

সূত্র: হাওজা নিউজ

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha